খুলনা প্রতিনিধিঃ
খুলনা মহানগরীর রায়েরমহল এলাকায় ৭১টি পরিবারের বৈধভাবে ক্রয় করা জমি দখল, পাঁচটি বসতবাড়িতে তালা ঝুলিয়ে উচ্ছেদ, চাঁদা দাবি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ তুলে বিএনপির কয়েকজন নেতাসহ স্থানীয় কয়েকজনের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সদস্যরা।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) খুলনা প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মোছাঃ ইরানী খাতুন। তিনি খুলনা মহানগরীর রায়েরমহল এলাকার ৭১টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষে বক্তব্য দেন।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, তাদের বসতভিটার ঠিকানা খুলনা মহানগরীর রায়েরমহল, আব্দুল মালেক সড়ক, পশ্চিমপাড়া, খালের ওপার (জেএল নং-৯, ম্যাপ শীট-১১, বর্তমান বিআরএস দাগ নং-৩৯১৮, খতিয়ান নং-৩৯৯০, হোল্ডিং নং-১২৪৪)।
তিনি দাবি করেন, ২০১৭ সাল থেকে ৭১টি পরিবার স্থানীয় মরহুম হামিদ চেয়ারম্যানের ওয়ারিশগণ এবং হাজেরা কবীরের ওয়ারিশগণের কাছ থেকে বৈধভাবে বিভিন্ন পরিমাণ জমি ক্রয় করেন। প্রত্যেকের নামে রেজিস্ট্রিকৃত দলিল, নামজারি (মিউটেশন) ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রয়েছে এবং নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে তারা সেখানে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছেন এবং অনেকেই নিজস্ব বসতবাড়ি নির্মাণ করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, সম্প্রতি হামিদ চেয়ারম্যানের ভাইয়ের ওয়ারিশগণ আদালতের একটি রায়ের কথা উল্লেখ করে জমির মালিকানা দাবি করেন। পরে বিএনপি-সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীদের মাধ্যমে তাদের জমি দখল করা হয়। সে সময় সেখানে পাঁচটি বসতবাড়ি ছিল।
ইরানী খাতুনের দাবি, প্রতিপক্ষ আদালতের একটি রায়ের কথা উল্লেখ করলেও তাদের নামে ওই জমির কোনো রেজিস্ট্রিকৃত দলিল, নামজারি (মিউটেশন) বা মালিকানাসংক্রান্ত অন্যান্য কাগজপত্র নেই। অন্যদিকে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রত্যেকের নামে বৈধ দলিল ও নামজারি রয়েছে। এ বিষয়ে তারা আদালতে আপিল দায়ের করেছেন এবং আপিল শুনানি শেষে আদালত স্থগিতাদেশ দিয়েছেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, উচ্ছেদের আগে তাদের কাউকে কোনো লিখিত নোটিশ দেওয়া হয়নি। এমনকি মৌখিকভাবেও কিছু জানানো হয়নি। গত ২০ জুলাই তাদের পাঁচটি বসতবাড়িতে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বর্তমানে ঘরের ভেতরে মূল্যবান আসবাবপত্র, প্রয়োজনীয় দলিলপত্র, শিক্ষার্থীদের বই-খাতা, পোশাকসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় মালামাল রয়ে গেছে। ঘরগুলো তালাবদ্ধ থাকায় সেগুলো বের করা সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি তাদের আশঙ্কা, অনুপস্থিতির সুযোগে ঘরের ভেতরে অবৈধ কোনো বস্তু রেখে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা বা হয়রানির চেষ্টা করা হতে পারে।
লিখিত বক্তব্যে আরও অভিযোগ করা হয়, ছোট খোকার ওয়ারিশ ইয়াসিন, মেহেদী, কাজল ও ফয়সালসহ কয়েকজন ব্যক্তি এবং নিজেদের বিএনপির পরিচয়দানকারী কয়েকজন খুলনা মহানগর তাতীদলের যুগ্ম আহ্বায়ক হুমায়ুন কবির, ১৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা সাকিরুল্লাহ তুহিন, পারভেজ ফকির, শফিক, ১৪ নম্বর ওয়ার্ড মহিলা দলের নেত্রী ফিরোজা পারভীন ও লিপি তাদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করছেন। তাদের অভিযোগ, এসব ব্যক্তি চাঁদা দাবি করছেন এবং চাঁদা না দিলে সেখানে আর বসবাস করতে দেওয়া হবে না বলে হুমকি দিচ্ছেন। এমনকি প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, এসব বিষয়ে থানায় অভিযোগ দিতে গেলেও তারা প্রত্যাশিত আইনি সহায়তা পাচ্ছেন না। তাদের দাবি, অভিযোগ গ্রহণ না করে থানা থেকে বলা হয়েছে, ‘উপর মহলের চাপ আছে, আপনারা স্থানীয়ভাবে সমাধান করেন।’
ইরানী খাতুন বলেন, বর্তমানে ৭১টি পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেকেই এক কাপড়ে ঘর থেকে বের হয়ে এসেছেন। শিশুদের লেখাপড়া ব্যাহত হচ্ছে এবং নারী, শিশু ও বয়স্ক সদস্যরা চরম অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
তিনি বলেন, তারা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিদ্বেষ নয়, বরং অভিযোগের নিরপেক্ষ ও আইনসম্মত তদন্ত, বৈধ কাগজপত্রধারী ক্রেতাদের অধিকার সংরক্ষণ এবং চাঁদামুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছেন।
সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তারা প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। একই সঙ্গে ন্যায়বিচার, জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা এবং তাদের বৈধ অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

